সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:
ঘুষ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগে আগে থেকেই আলোচিত ভূমি কর্মকর্তা (নায়েব) শর্মিষ্ঠা সরকার। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিকবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এবার তাঁর বিরুদ্ধে প্রেমের সম্পর্কের মাধ্যমে আরও দুই যুবককে আর্থিক ও সামাজিকভাবে নিঃস্ব করার অভিযোগ উঠেছে।স্থানীয়দের দাবি, কর্মস্থলে প্রভাব বিস্তার করে ভূমিসেবা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সম্পর্ককেও স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেন শর্মিষ্ঠা। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখনো প্রয়োজন।
প্রেমের ফাঁদে দুই যুবককে ব্যবহারের অভিযোগ
সরেজমিনে অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভাড়াশিমলা ভূমি অফিসে কর্মরত থাকার সময় স্থানীয় দুই যুবক—ভাড়াশিমলার সনজিৎ ও তারালীর সুমনের সঙ্গে শর্মিষ্ঠার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় বলে অভিযোগ।সনজিতের দাবি, ভূমি অফিসের বিভিন্ন কাজের সূত্রে শর্মিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়। শর্মিষ্ঠা নিজের পারিবারিক নানা সমস্যার কথা বলায় তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েন সনজিৎ। একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি হয়।
সনজিতের অভিযোগ, তিনি সম্পর্কটিকে সত্যিকার ভালোবাসা হিসেবে দেখলেও পরবর্তীতে বুঝতে পারেন, ওই সম্পর্কের পেছনে ব্যক্তিগত ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় ছিল। তাঁর দাবি, সম্পর্কের কারণে তিনি আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
অন্যদিকে সুমনের সঙ্গে শর্মিষ্ঠার পরিচয় হয় গাড়ি ভাড়ার ব্যবসার সূত্রে। সুমনের দাবি, পরবর্তীতে তিনি শর্মিষ্ঠার স্কুটি চালাতেন এবং নিয়মিত তাঁকে ভাড়াশিমলা ভূমি অফিসে নিয়ে যেতেন। অফিসের অনেকেই বিষয়টি জানতেন বলেও তাঁর দাবি।সুমনের অভিযোগ, একপর্যায়ে শর্মিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি হয়। কিন্তু পরে তিনি বুঝতে পারেন, ভালোবাসার সম্পর্কের আড়ালে তাঁকে ব্যবহার করা হয়েছে।ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগও পুরোনো স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাড়াশিমলা ভূমি অফিসে কর্মরত থাকাকালে শর্মিষ্ঠার বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেন ও সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগ ওঠে। নামজারি, খারিজসহ ভূমিসংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ঘুষ ছাড়া সাধারণ মানুষকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হতে হতো। এসব অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময় সংবাদ প্রকাশ হলেও দৃশ্যমান প্রতিকার হয়নি বলে তাঁদের দাবি।
পরে তাঁকে সাতক্ষীরা সদর থেকে ফিংড়ী ভূমি অফিসে বদলি করা হলেও অভিযোগের আলোচনা থামেনি।
সহকর্মী ও অন্যদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ
শর্মিষ্ঠা সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক পুরুষের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগও দীর্ঘদিনের বলে দাবি স্থানীয়দের। তাঁর কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে কয়েকজন পুরুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা স্থানীয়ভাবে আলোচিত হয়েছে।
সহকর্মী নায়েব ইউনুস চিশতীর সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে। তবে এ ধরনের ব্যক্তিগত সম্পর্কের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও সরকারি নথিপত্র পর্যালোচনা প্রয়োজন।
গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে অডিও ও চ্যাট ফাঁস
সম্প্রতি শর্মিষ্ঠা সরকারের সঙ্গে এক গণমাধ্যমকর্মীর কথোপকথনের কথিত অডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যক্তিগত চ্যাট ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ফাঁস হওয়া একটি অডিওতে শর্মিষ্ঠার কণ্ঠ হিসেবে দাবি করা ব্যক্তিকে আবেগঘন বক্তব্য দিতে শোনা যায়। তবে অডিওটির সত্যতা, কণ্ঠস্বর এবং সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
ওই গণমাধ্যমকর্মীর দাবি, শর্মিষ্ঠার বিরুদ্ধে দুর্নীতির সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়। পরবর্তীতে নিয়মিত যোগাযোগের একপর্যায়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি হয়। তাঁর অভিযোগ, নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আড়াল করতে শর্মিষ্ঠা তাঁকে ব্যবহার করেছেন এবং সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে আর্থিক সুবিধাও নিয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্য সনজিৎ বলেন,“আমি তাঁকে সত্যিকার অর্থে ভালোবেসেছিলাম। কিন্তু পরে বুঝতে পারি, সম্পর্কটি তাঁর স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যম ছিল। এই সম্পর্কের কারণে আমি আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।”সুমনের ভাষ্য,“গাড়ি ভাড়া দেওয়ার সূত্রে পরিচয়। পরে তাঁর কথায় ব্যক্তিগত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি। নিয়মিত তাঁর স্কুটি চালিয়ে অফিসে নিয়ে যেতাম। পরে বুঝতে পারি, ভালোবাসার নামে আমাকে ব্যবহার করা হয়েছে।”নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
এদিকে স্থানীয়দের দাবি, একের পর এক অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশের পরও যদি কার্যকর তদন্ত না হয়, তাহলে প্রকৃত সত্য সামনে আসবে না। তাই শর্মিষ্ঠা সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।অভিযোগের পক্ষে অডিও, চ্যাট ও অন্যান্য নথি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। তবে এসব উপকরণের সত্যতা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।শর্মিষ্ঠা সরকারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে শর্মিষ্ঠা সরকারের বক্তব্য জানতে তাঁর ব্যবহৃত তিনটি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে নম্বরগুলো বন্ধ পাওয়া যাওয়ায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।