সম্পাদকীয়
মাদকমুক্ত সমাজ চাইলে শুধু মাদকসেবী নয়, ধরতে হবে মাদকের মূল হোতাদের
মাদক একটি পরিবারকে ধ্বংস করে, একটি প্রজন্মকে বিপথে নিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সমাজের ভিতকে দুর্বল করে। মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্ন আমাদের সবার। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু মাদকসেবীদের গ্রেপ্তার করে দায় শেষ করলে চলবে না; মাদকের উৎস, সরবরাহকারী, কারবারি ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রশ্ন হচ্ছে—একজন মাদকসেবী মাদক কোথা থেকে পাচ্ছে? কে তাকে মাদক সরবরাহ করছে? কারা এই অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করছে? কারা এর পেছনে অর্থ ও প্রভাব খাটাচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। কারণ একজন মাদকসেবীকে আটক করলে সাময়িকভাবে একজন ব্যক্তি মাদক থেকে দূরে থাকতে পারে, কিন্তু মাদকের সরবরাহ বন্ধ না হলে নতুন করে আরও অনেক তরুণ সেই পথে জড়িয়ে পড়বে।
তাই মাদকবিরোধী অভিযানে ‘সেবী ধরো, কারবারি ছাড়ো’—এমন কোনো নীতি চলতে পারে না। মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীর ভূমিকা আলাদাভাবে বিবেচনা করে আইন প্রয়োগ করতে হবে। যারা মাদক বিক্রি করে, সরবরাহ করে কিংবা এই অবৈধ ব্যবসার পেছনে অর্থ, ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যবহার করে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, মাদকাসক্ত একজন মানুষও একটি পরিবারের সন্তান। অনেকেই কৌতূহল, বন্ধুবান্ধবের প্ররোচনা, পারিবারিক অশান্তি কিংবা নানা সামাজিক কারণে মাদকের জালে জড়িয়ে পড়ে। তাই যারা আসক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। শুধু শাস্তি দিয়ে নয়, একজন মাদকাসক্তকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও নিতে হবে।
মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি পরিবার ও সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, তার আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকের ক্ষতিকর দিক নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো দরকার।
মাদকবিরোধী অভিযান হতে হবে নিরপেক্ষ, তথ্যভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক। কারও রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান, অর্থ কিংবা প্রভাব যেন আইনের প্রয়োগে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। একই অপরাধে একজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, আর প্রভাবশালী কারও ক্ষেত্রে নীরব থাকা হবে—এমন বৈষম্য মাদক নির্মূলের পথে বড় বাধা।
স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক, ধর্মীয় নেতা, সামাজিক সংগঠন ও সচেতন নাগরিকদের নিয়ে মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মাদক ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার নিরাপদ ব্যবস্থা থাকা জরুরি, যাতে সাধারণ মানুষ ভয়ভীতি ছাড়াই প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে পারে।
মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান দিয়ে শেষ হওয়ার নয়। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও তরুণ সমাজকে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, পাঠাগার ও সৃজনশীল উদ্যোগ বাড়াতে হবে, যাতে তরুণ প্রজন্ম সুস্থ বিনোদন ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে কোনো মা-বাবাকে সন্তানের মাদকাসক্তির কারণে কাঁদতে হবে না; কোনো তরুণ মাদকের কারণে তার ভবিষ্যৎ হারাবে না; কোনো পরিবার মাদকের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতির শিকার হবে না।
মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে তাই শুধু অভিযান নয়—প্রয়োজন মাদকের উৎস বন্ধ করা, কারবারিদের আইনের আওতায় আনা, আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, পরিবারকে সচেতন করা এবং পুরো সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করা।মাদকবিরোধী লড়াই কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। আজ আমরা যদি মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে দাঁড়াতে না পারি, তাহলে আগামী প্রজন্মকে এর মূল্য দিতে হবে।
তাই আসুন, মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি। মাদকসেবীকে সংশোধন ও পুনর্বাসনের সুযোগ দিই, মাদক কারবারির বিরুদ্ধে কঠোর ও নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করি এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সুস্থ ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলি।
লেখক:
আল আমিন সরদার
সম্পাদক ও প্রকাশক
দৈনিক সোনার বাংলাদেশ