নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা:
সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা থানার সরুলিয়া ইউনিয়নের বড়বিলায় গ্রামের নাজমুল নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে পুলিশি পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, মানুষকে মামলা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং নিরীহ ব্যক্তিদের হয়রানি করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, নাজমুল নিজেকে পুলিশের সোর্স ও পুলিশের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।
অভিযোগ রয়েছে, গত প্রায় ১৭ বছর ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে মামলা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়সহ নানা ধরনের হয়রানি করে আসছেন তিনি। কারও সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হলে কিংবা দাবি করা অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে পুলিশ দিয়ে মামলা করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হতো বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইএসআই কালামের মাধ্যমে নাজমুল পাটকেলঘাটা পুলিশের কথিত সোর্স হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর থেকে পুলিশের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন সময়ে বিএনপি ও শিবিরের নেতাকর্মীদের বিভিন্নভাবে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার পর তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে নাজমুলের বিরুদ্ধে। অনেক ক্ষেত্রে তিনি নিজেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাড়িতে গিয়ে টাকা দাবি করতেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার দাবিকৃত অর্থ দিতে না চাইলে পুলিশ দিয়ে মামলা ও হয়রানির ভয় দেখানো হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, বর্তমানে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পরও নাজমুল তার কথিত পুলিশ-সংশ্লিষ্ট পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। কোথাও নিজেকে পুলিশের লোক, আবার কোথাও পুলিশের পরিচিত ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এমনকি পুলিশের পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বা ব্যক্তির কাছে প্রবেশ করে পরে মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে চলে যাওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীদের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
চুরির অভিযোগও উঠেছে
সম্প্রতি বড় বিলাই এলাকায় চুরির একটি ঘটনায় নাজমুলের নাম জড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ বা তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য জানা প্রয়োজন। অভিযোগটি সত্য হলে দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের বিষয়টিও নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়বে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—একজন ব্যক্তি যদি সত্যিই পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করেন, তাহলে তার পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে কেউ যেন সাধারণ মানুষকে হয়রানি বা অর্থ আদায়ের কাজে ব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে পুলিশের নজরদারি কোথায়?
পুলিশের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজির অভিযোগ, তদন্তের দাবি
স্থানীয় কয়েকজন ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, নাজমুল বিভিন্ন সময় পুলিশে মামলা করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবি করেছেন। তার কথিত পুলিশ-সংশ্লিষ্ট পরিচয়ের কারণে অনেকে ভয়ে মুখ খুলতে চান না। ফলে বছরের পর বছর ধরে এসব অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর তদন্ত হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সচেতন মহলের দাবি, নাজমুল প্রকৃতপক্ষে পুলিশের কোনো অনুমোদিত সোর্স কি না, তিনি কোন কর্মকর্তার সঙ্গে কীভাবে কাজ করেছেন, তার বিরুদ্ধে পূর্বে কোনো অভিযোগ বা মামলা রয়েছে কি না এবং বর্তমানে পুলিশের নাম ব্যবহার করে কোথাও অর্থ আদায় বা ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে কি না—এসব বিষয় তদন্ত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কারও বিরুদ্ধে চুরি, চাঁদাবাজি কিংবা প্রতারণার অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়া জরুরি। অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপপ্রচারের বিষয়টিও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পুলিশের বক্তব্য কী?
নাজমুল বর্তমানে পুলিশের কোনো বৈধ সোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কি না, কিংবা পুলিশের সঙ্গে তার কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক রয়েছে কি না—এ বিষয়ে পাটকেলঘাটা থানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বক্তব্য জানা জরুরি। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজি, পুলিশ পরিচয় ব্যবহার, মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো এবং সাম্প্রতিক চুরির অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।অভিযোগগুলোর বিষয়ে নাজমুলের বক্তব্যও নেওয়া প্রয়োজন। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন এখন একটাই—পুলিশের নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানো এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগ যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে নাজমুলের এসব কর্মকাণ্ডের শেষ কোথায়?