সম্পাদকীয় কলম’বাংলাদেশের দুর্নীতি শেষ হবে কবে বাংলাদেশে দুর্নীতি এখন আর শুধু একটি শব্দ নয়, এটি একটি বাস্তবতা—যা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রায় প্রতিটি স্তরে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে ভূমি ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন প্রকল্প, নিয়োগ-বাণিজ্য, ঠিকাদারি কার্যক্রম এমনকি সাধারণ সেবাপ্রাপ্তিতেও দুর্নীতির অভিযোগ প্রায় নিয়মিত শোনা যায়। ফলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে—এই দুর্নীতি আসলে শেষ হবে কবে?দুর্নীতি একদিনে তৈরি হয়নি, আবার একদিনে শেষও হবে না। এটি একটি দীর্ঘ সময়ের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহির ঘাটতির ফল। যখন কোনো ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা দুর্বল হয়ে পড়ে, যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যক্তিগত স্বার্থ প্রাধান্য পায় এবং যখন আইনের প্রয়োগ সমানভাবে হয় না—তখন দুর্নীতি একটি ‘স্বাভাবিক অনিয়মে’ পরিণত হয়, যা সমাজে ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্যতার মতো অবস্থায় চলে যায়।বাংলাদেশে উন্নয়ন হয়েছে, অবকাঠামো বেড়েছে, প্রযুক্তির ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ই-গভর্নেন্স, ডিজিটাল সেবা, অনলাইন ভূমি রেকর্ড, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসসহ নানা উদ্যোগ অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির সুযোগ কমিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এসব উদ্যোগ কি দুর্নীতির মূল শিকড় উপড়ে ফেলতে পেরেছে? বাস্তবতা বলছে, এখনো অনেক ক্ষেত্রেই দুর্নীতি কৌশল বদলিয়ে টিকে আছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতি দমন শুধু আইন দিয়ে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং কঠোর জবাবদিহি ব্যবস্থা। পাশাপাশি বিচার ব্যবস্থার দ্রুততা এবং নিরপেক্ষতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিচার বিলম্বিত হলে অন্যায়ের সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক মানসিকতা। দুর্নীতি শুধু বড় পদে থাকা ব্যক্তিদের মাধ্যমে ঘটে না, বরং অনেক সময় সাধারণ পর্যায়েও এটি বিস্তার লাভ করে। ছোট ছোট অনিয়মকে ‘চলেই তো যায়’ মানসিকতায় গ্রহণ করার প্রবণতা বড় দুর্নীতিকে টিকিয়ে রাখে। তাই সমাজের প্রতিটি স্তরে নৈতিকতা ও প্রতিবাদী মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি।তবে আশার কথা হলো—পরিবর্তনের ইঙ্গিতও রয়েছে। তরুণ প্রজন্ম, গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী ভূমিকা, সামাজিক সচেতনতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছ ব্যবস্থার বিস্তার ধীরে ধীরে দুর্নীতির ক্ষেত্র সংকুচিত করছে। অনেক ক্ষেত্রেই এখন প্রশ্ন উঠছে, তদন্ত হচ্ছে এবং কিছু ক্ষেত্রে জবাবদিহিও নিশ্চিত হচ্ছে।দুর্নীতি শেষ হবে কবে—এই প্রশ্নের সরাসরি কোনো সময়সীমা নেই। তবে এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়, যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণভাবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মধ্যে আসবে, যখন আইনের শাসন নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ হবে এবং যখন সমাজ দুর্নীতিকে স্বাভাবিক হিসেবে না দেখে প্রতিরোধ করবে—তখনই প্রকৃত পরিবর্তনের শুরু হবে।শেষ পর্যন্ত, দুর্নীতি নির্মূল কোনো একক উদ্যোগের ফল নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং জনগণ—এই তিন শক্তির সম্মিলিত প্রয়াস ছাড়া দুর্নীতি কখনোই পুরোপুরি শেষ হবে না। তবে ইচ্ছা, সদিচ্ছা এবং কঠোর অবস্থান থাকলে দুর্নীতি অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।