আন্তর্জাতিক ডেস্ক’ দেশটির সেনাবাহিনীর মিডিয়া উইং আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)-এর মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী ভারতকে ‘সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী তোমরাই। কেউ তোমাদের কথা শোনে না, কেউ বিশ্বাসও করে না।’সংবাদমাধ্যম দ্য ডন বলছে, ‘মারকা-ই-হক’-এর এক বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ওই সংবাদসম্মেলনে জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী ভারতের বিরুদ্ধে এই কঠোর বক্তব্য দেন। তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তান নৌবাহিনীর উপপ্রধান (অপারেশনস) রিয়ার অ্যাডমিরাল শাফাআত আলী এবং বিমানবাহিনীর উপপ্রধান (প্রকল্প) এয়ার ভাইস মার্শাল তারিক গাজী।গত বছরের ২২ এপ্রিল পেহেলগাম হামলা থেকে শুরু করে পাকিস্তানের ‘অপারেশন বুনইয়ানুম মারসুস’ এবং ১০ মে যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে ভারত-পাকিস্তানের সামরিক উত্তেজনার যে অধ্যায় শেষ হয়, পাকিস্তান সেটিকে ‘মারকা-ই-হক’ বা ‘সত্যের যুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করে থাকে।আরব সাগরে জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল পাকিস্তান নৌবাহিনীএদিনের সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই আহমেদ শরিফ চৌধুরী দেশবাসীকে ‘মারকা-ই-হক’-এর এক বছর পূর্তির শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করেছে এবং বহু-মাত্রিক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে শত্রুকে পরাজিত করেছে। তিনি বলেন, ‘আজ আমরা কী হয়েছিল তা নিয়ে খুব বেশি কথা বলব না। বরং ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত সময় নিয়ে বেশি আলোচনা করব’। তিনি আরও বলেন, এই সংঘাতের ‘কৌশলগত পরিণতি’ তুলে ধরা হবে।
আইএসপিআর প্রধান বলেন, ‘মারকা-ই-হক’-এর ১০টি কৌশলগত পরিণতি রয়েছে। এর প্রথমটি হলো— পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদের উৎস হিসেবে উপস্থাপনের ভারতীয় বয়ান ‘সমাধিস্থ’ হয়েছে। তার ভাষায়, কোনও প্রমাণ ছাড়াই পাকিস্তানকে ভারতে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। পেহেলগাম ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও পাকিস্তানের তোলা প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও মেলেনি।তিনি প্রশ্ন করেন, ‘(পেহেলগাম হামলায় পাকিস্তানের জড়িত থাকার) প্রমাণ কোথায়?’। এরপর তিনি বলেন, ‘কেউ এটা বিশ্বাস করে না। সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী তোমরাই। কেউ তাদের কথা শোনে না, কেউ বিশ্বাসও করে না’। তিনি বলেন, দ্বিতীয় কৌশলগত পরিণতি হলো— পুরো অঞ্চলে পাকিস্তানের ‘নিরাপত্তা স্থিতিশীলতার প্রধান শক্তি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া। তিনি বলেন, ‘এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা দূত হলো পাকিস্তান এবং পাকিস্তানের বর্তমান নেতৃত্ব।’ব্ল্যাকমেইলের ফাঁদে ফেলে গুপ্তচরবৃত্তি, পাকিস্তানে ‘র’ এজেন্ট গ্রেপ্তার
তৃতীয় কৌশলগত পরিণতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি ভারতের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমালোচনা করেন। তার ভাষায়, ‘ভারতীয় সামরিক নেতৃত্বের রাজনীতিকরণ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামরিকীকরণ’ ঘটেছে। তিনি বলেন, ‘ওদের সামরিক বাহিনী আগে পেশাদার ছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখন তা রাজনীতিকরণ হয়েছে।’
তিনি উদাহরণ হিসেবে ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রধানের একটি মন্তব্যের কথা তুলে ধরেন। তার দাবি, ‘কয়েক মাস পরে এসে তিনি বললেন— আজ জানতে পারলাম আমরাও কিছু বিমান ভূপাতিত করেছি। এটা সামরিক নেতৃত্বের রাজনীতিকরণ’। তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা কেন নিজেদের অ্যাডমিরাল, জেনারেল আর এয়ার মার্শালদের কৌতুকের পাত্র বানাচ্ছেন? এটা করবেন না।’অন্যদিকে পাকিস্তান তথ্য যেমন, তেমনভাবেই উপস্থাপন করেছে বলে দাবি করেন তিনি। আইএসপিআর প্রধান আরও বলেন, ভারতীয় রাজনীতিকদের বক্তব্য দেখে মনে হয় তারা ‘যুদ্ধবাজ’। তার মতে, সামরিক বাহিনীর রাজনীতিকরণ এবং রাজনীতির সামরিকীকরণ ‘বিপজ্জনক’।বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানের উত্থান: গুরুত্ব হারাচ্ছে বিশ্বশক্তি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর ভারত?চতুর্থ কৌশলগত পরিণতি হিসেবে তিনি বলেন, বিশ্ব এখন বুঝতে পেরেছে ভারত কীভাবে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা বাইরের ওপর চাপিয়ে দেয় এবং বাইরের সমস্যাকে অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে পরিণত করে। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদকে রাষ্ট্রীয় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
তিনি দাবি করেন, ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যার মধ্যে রয়েছে সংখ্যালঘু ও কাশ্মীরিদের দমন-পীড়ন। তার ভাষায়, ‘এটি এক ধরনের ভ্রান্ত শ্রেষ্ঠত্ববোধ ও অহংকার থেকে আসে’। তিনি বলেন, ভারত নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধান করতে চায় না। তাই তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে যে— দেশটি ভারতে সন্ত্রাসবাদে জড়িত।কাশ্মীর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কাশ্মীর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি বিরোধপূর্ণ অঞ্চল। এটিভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয় যে সেখানে জনসংখ্যার চিত্র বদলে দেয়া হবে’। তিনি আবারও অভিযোগ করেন, ভারত পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদে মদদ দিচ্ছে। এমনকি নিজেদের দেশেও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পর অন্যদের দোষারোপ করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।যেভাবে বিশ্ব মঞ্চে প্রভাবশালী ব্যক্তি হয়ে উঠলেন পাকিস্তানের আসিম মুনিরতার ভাষায়, ‘মারকা-ই-হক’-এর পর বিশ্ব এখন বুঝতে পেরেছে ভারত কীভাবে এসব ভণ্ডামিপূর্ণ কাজ করে। পঞ্চম কৌশলগত পরিণতি হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ‘ভারতীয় গণমাধ্যমের আসল চেহারা এবং তাদের তথ্যযুদ্ধের ব্যর্থতা’ প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেন, সংঘাত চলাকালে ভারত পাকিস্তানি গণমাধ্যম বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল, যা এখনও চলছে। তবে এতে কোনও সমাধান হবে না বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘সত্য বলুন। পাকিস্তান সেটাই করেছে। আজকের তথ্যযুদ্ধের যুগে শুধু সত্যই টিকে থাকতে পারে।’
ষষ্ঠ কৌশলগত পরিণতি হিসেবে তিনি যুদ্ধের ‘রূপান্তরিত চরিত্র’-এর কথা বলেন। তার ভাষায়, ‘এখন যুদ্ধ শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়। এখন যুদ্ধ হয় স্থল, সমুদ্র, আকাশ, সাইবারস্পেস এবং মানুষের মনেও’। তিনি দাবি করেন, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী ‘মারকা-ই-হক’-এর সময় সব ক্ষেত্রেই ভারতের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত ছিল এবং এখনও রয়েছে।
সপ্তম কৌশলগত পরিণতি হিসেবে তিনি বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পাকিস্তানের সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতার কথা বলেন। অষ্টম পরিণতি হিসেবে উল্লেখ করেন প্রতিরোধ সক্ষমতার সুস্পষ্ট প্রতিষ্ঠা। তিনি বলেন, ‘দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে যুদ্ধের সুযোগ আছে বলে যারা মনে করে, তারা পাগল। এটা উন্মাদনা।’উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ইমেজিং স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করল পাকিস্তানতার ভাষায়, ‘যদি কেউ যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে চায়, তাহলে আমাদের দৃঢ় অবস্থান নিয়ে যেন কোনও সন্দেহ না থাকে’। নবম কৌশলগত পরিণতি হিসেবে তিনি বলেন, পাকিস্তান এখন ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল মধ্যম শক্তি হিসেবে স্বীকৃত।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের বিভিন্ন পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘মারকা-ই-হক’-এর পর পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা বেড়ে গিয়েছিল। এরপর অক্টোবর মাসে পাকিস্তান প্রতিবেশী আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী অবকাঠামোতে হামলা চালায়। এর পর ঘটনাগুলো কমে আসে বলে দাবি করেন তিনি।তিনি আবারও বলেন, পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদে ভারতের ভূমিকা রয়েছে এবং আফগানিস্তানকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তার ভাষায়, ‘মারকা-ই-হকে শিক্ষা পাওয়ার পর ভারত কাকে ফোন করেছিল, দেখেছেন? আফগান তালেবান সরকারের তথাকথিত পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে।’