নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা (শ্যামনগর):
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী ইউনিয়নে গাজী শাহ আলম নামে এক ব্যক্তিকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ক্রমেই বাড়ছে। তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান, লুটপাট, চাঁদাবাজি, হামলা ও ছিনতাইসহ নানা গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন এলাকাবাসী।স্থানীয় বাসিন্দা কওছার আলী গাজীর অভিযোগ, ২০২৩ সালে ব্যবসায়িক কাজে যাওয়ার পথে শাহ আলমের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত তাকে পথরোধ করে মারধর করে এবং অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ করা হলেও তিনি কোনো প্রতিকার পাননি। তার দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া হয়।এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাতে পরানপুর বাজারে সংঘটিত হয় বড় ধরনের লুটপাটের ঘটনা। অভিযোগ রয়েছে, শাহ আলমের নেতৃত্বে ৩০-৪০ জনের একটি দল তিনটি দোকানের শাটার ভেঙে প্রায় এক কোটি টাকার মালামাল ও নগদ অর্থ লুট করে নেয়। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে কওছার আলী গাজীর দোকান থেকেই প্রায় ৩৫-৪০ লাখ টাকার মালামাল লুট হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই ঘটনায় নিমাই রপ্তান ও পরেশ গাইনের দোকান থেকেও বিপুল ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে।ভুক্তভোগীরা জানান, এসব ঘটনায় সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেওয়া হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঘটনাগুলো বারবার আড়াল করা হচ্ছে। এমনকি সংবাদ প্রকাশের জেরে ভুক্তভোগীদের ওপর হামলা ও মব তৈরি করে মারধরের অভিযোগও রয়েছে শাহ আলম ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সাবেক সংসদ সদস্য জগলুল হায়দারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শাহ আলম আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন। সে সময় জমি দখল, চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান এবং সীমান্ত দিয়ে অবৈধ গরু পারাপারের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নতুন করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ ওঠে। বর্তমানে তিনি নিজেকে বিএনপির নেতা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। তবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) সাতক্ষীরা জেলা কমিটি থেকে ২০২৪ সালের ১৬ নভেম্বর তাকে বহিষ্কার করা হয়।এদিকে সীমান্তবর্তী কালিন্দী নদীপথ ব্যবহার করে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র ও মাদক পাচারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অস্ত্র স্থানীয় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন এলাকাবাসী। এমনকি শ্যামনগর থানায় হামলা, ভাঙচুর ও অস্ত্র লুটের ঘটনাতেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি যৌথ বাহিনীর অভিযানে তার এক সহযোগীকে অস্ত্রসহ আটক করা হলেও থেমে নেই তার সিন্ডিকেটের কার্যক্রম। এছাড়া গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২০ কোটি টাকার চুক্তিতে সাবেক এমপি জগলুল হায়দার ও শেখ পরিবারের সদস্যদের নৌকাযোগে ভারত পালাতে সহায়তার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত শাহ আলম। তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও রয়েছে বিতর্ক।সম্প্রতি এক নারীর সঙ্গে কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় তার ব্যক্তিগত আচরণ নিয়েও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। এর আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাকে গরু চোর, নারী নির্যাতনকারী ও কুখ্যাত সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহল দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে শাহ আলম ও তার সহযোগীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এসব অপরাধের বিচার না হলে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে।