সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) সাতক্ষীরা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) উসমান সরওয়ার আলম এবং মোটরযান পরিদর্শক ওমর ফারুক–এর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ দিন দিন আরও বিস্তৃত ও গভীর হচ্ছে। প্রথম পর্বে ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহন রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং পরীক্ষায় অনিয়মের চিত্র উঠে আসলেও, অনুসন্ধানে এবার সামনে এসেছে সংঘবদ্ধ দুর্নীতি, দালালনির্ভর সেবা এবং অস্বাভাবিক সম্পদের অভিযোগ।
দালালনির্ভর সেবা ও শক্তিশালী ‘সিন্ডিকেট’
স্থানীয় পরিবহন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বিআরটিএ সাতক্ষীরা কার্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি সক্রিয় দালালচক্র কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, এই দালালচক্র সহকারী পরিচালক উসমান সরওয়ার আলম ও মোটরযান পরিদর্শক ওমর ফারুকের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রশনে গড়ে উঠেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ—দালাল ছাড়া বিআরটিএ অফিসে কোনো সেবা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে নির্ধারিত সরকারি ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ই যেন এই চক্রের মূল উদ্দেশ্য।
ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক আবেদনকারী জানান, ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস কিংবা রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত ফাইল মাসের পর মাস ঝুলে থাকে। কিন্তু দালালের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিলে, উসমান সরওয়ার আলম ও মোটরযান পরিদর্শক ওমর ফারুক সংশ্লিষ্ট শাখায় তদবির করলেই অল্প সময়ের মধ্যেই কাজ সম্পন্ন হয়।
এতে করে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন, যা সরকারি সেবা ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে।
অযোগ্য চালকের লাইসেন্স, বাড়ছে সড়ক ঝুঁকি
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, যথাযথ ড্রাইভিং পরীক্ষা ছাড়াই অযোগ্য ও অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের লাইসেন্স প্রদান করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে মোটরযান পরিদর্শক ওমর ফারুকের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
সচেতন মহলের মতে, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সড়ক নিরাপত্তায়—বাড়ছে দুর্ঘটনা, প্রাণ হারাচ্ছেন নিরীহ পথচারী ও যাত্রীরা।
একজন পরিবহন শ্রমিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“যারা ঠিকভাবে গাড়ি চালাতেই জানে না, তারাই আজ বৈধ লাইসেন্সধারী চালক—এটা আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্ক।”
প্রশ্নবিদ্ধ সম্পদ ও জীবনযাপন
এদিকে, সরকারি চাকরির সীমিত আয়ের বিপরীতে উসমান সরওয়ার আলম ও ওমর ফারুকের জীবনযাপন ও সম্পদের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের ঘোষিত আয়ের সঙ্গে দৃশ্যমান সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই।
তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো দৃশ্যমান তদন্ত বা যাচাই-বাছাই শুরু করেনি।
প্রশাসনের নীরবতা, বাড়ছে জনক্ষোভ
একাধিক গুরুতর অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নীরব ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিআরটিএ সাতক্ষীরা কার্যালয় পুরোপুরি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হবে।
সুষ্ঠু তদন্তের জোর দাবি
সুশীল সমাজ ও পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টদের দাবি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন
বিআরটিএ অফিসে দালালচক্র উচ্ছেদ
তদন্তকালীন সময়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও মোটরযান পরিদর্শককে সাময়িক বরখাস্ত
এই পদক্ষেপগুলোই পারে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে। সচেতন নাগরিকরা আশা করছেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দ্রুত বিষয়টি আমলে নিয়ে তদন্ত শুরু করবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমেই জনআস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে।