সাতক্ষীরা অফিসঃসাতক্ষীরা সদর সাব রেজিস্ট্রার রিপন মুন্সির বদলির পরে এবার নতুন করে ঘুষ দূর্ণীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস। রেট বেড়েছে ঘুষের। সদ্য যোগদান করা সাব-রেজিস্ট্রার অমায়িক বাবু নিজেকে আইন সচিবের লোক পরিচয় দিয়ে বাড়িয়েছেন ঘুষের রেট। টাকা ছাড়া যেন কোন কাজই হয় না এই অফিসে। ঘুষের টাকা দিয়ে নাকাল সাতক্ষীরাবাসি। সূত্র জানায়, আলোচিত সাতক্ষীরা সদর সাব-রেজিস্ট্রার রিপন মুন্সি থাকা কালিন সময়ে ৫ আগস্ট ২০২৪ এর পর থেকে ঘুষ দূর্ণীতি অনেকাংশে চেপে থাকলেও নতুন সাব-রেজিস্ট্রার অমায়িক বাবু গত ১৭/৪/২০২৫ তারিখে যোগদানের পরে টাকা ছাড়া কোন কাজ হচ্ছে না সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে। অমায়িক বাবুর আগের কর্মস্থল খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত থাকার সময় তার বিরুদ্ধে রয়েছে পাহাড়সম দূর্ণীতির অভিযোগ। এমনকি সাতক্ষীরা অফিসের কর্মচারিদের একাংশ তার কার্যক্রমে ক্ষুব্ধ। তিনি সব টাকা একাই নেন এমটাই অঅিযোগ এই অফিসের কর্মচারীদের। উৎকোচের টাকার একটা অংশের ভাগ পায় সিন্ডিকেট। এই টাকা তোলেন অফিস সহকারি মহসিন। মহসিনের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চলছে সাতক্ষীরা সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস। সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য অফিস সহায়ক মহসিনের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হওয়ায় সে নিজেকে গত কয়েক বছর আইন মন্ত্রীর লোক পরিচয়ে বেশ দাপটের সাথে চলতো। তার নিয়ম অনুযায়ি বদলির সময় গত এক বছর আগে বদলি হওয়ার কথা থাকলেও জেলা রেজিস্ট্রারের সুদৃষ্টির কারনে তার বদলি হয়না।
জানা গেছে, সাব সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের অফিস সহায়ক মহসিন ও জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের হাবিবুর রহমান হাবিব জেলা রেজিস্ট্রারের লোক হিসাবে পরিচিত। জেলা রেজিস্ট্রারের অর্থিকসহ সকল বিষয়ে তারা দু’জন দেখে থাকেন। জেলা রেজিস্ট্রারের লোক হওয়ায় তারা বছরের পর বছর একই অফিসে গেড়ে বসে আছে। গড়ে তুলেছে শক্তিশালি সিন্ডিকেট। জেলা রেজিস্ট্রার বাবদ সদর অফিসের টাকা তোলেন মহাসিন ও জেলাব্যাপি অন্য অফিসগুলোর জেলা রেজিস্ট্রারের নামের টাকা ওঠান টিসি সহকারি হাবিব ও বাচ্চু।বর্তমান সদর সাব-রেজিস্ট্রার মহসিনের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ উত্তোলন করান। তিনি সরকারি রাজস্ব ফাঁকি ও জনভোগান্তির রাজ্য তৈরি করছেন। মহসিনের সহযোগিতা করেন নৈশপ্রহরীর জাহিদ ও লিটু। সূত্র জানায়, একটি সাফ-কবলা দলিল লাখে এক হাজার টাকা, পরবর্তী ১০ লাখ পর্যন্ত প্রতি লাখে ৪’শ টাকা, দশ লাখের ঊর্ধ্বে হলে প্রতি লাখে ৩০০ টাকা এবং দলিল মূল্য এক কোটির ঊর্ধ্বে হলে আলোচনার মাধ্যমে রেট ঠিক করা হয়। দানপত্র, হেবাবিল এওয়াজ, এওয়াজ বদল, বন্টননামা, না-দাবি দলিলসহ সকল প্রকার দলিল রেজিস্ট্রিতে তার রেট অনুযায়ী অর্থ দিতে না পারলে দলিল রেজিস্ট্রি হয় না। এ সকল দলিলের ক্ষেত্রে তিনি ১০ হাজার টাকা থেকে ত্রিশ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেন। এক ব্যক্তির দুই নাম হলে প্রত্যয়ন আনার পরেও চুক্তিতে টাকা নেওয়া হয়। তবে দলিলে দাতা বা গ্রহীতা অথবা জমির কোন সমস্যা থাকলে ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেন। হিন্দুদের জমি রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে ঘুষের অর্থ আদায়ের জন্য তিনি বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। হিন্দু ধর্মালম্বীরা জমি বিক্রয় করে ভারতে চলে যায় বলে তিনি হিন্দুদের জমি রেজিস্ট্রিতে প্রাথমিকভাবে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট দলিল লেখকের মাধ্যমে দাতা ও গ্রহীতাকে খাস-কামরায় ডেকে একান্তে কথা বলেন। সীমান্ত এলাকায় হিন্দুদের জমি রেজিস্ট্রিতে কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে মর্মে দাতাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। প্রতিটি হিন্দু ধর্মালম্বাী মানুসের জমি রেজিস্ট্রেশনে তিনি দুই লক্ষ থেকে দশ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঘুষ গ্রহণ করেন।সূত্র আরও জানায়, যোগদানের শুরুতেই সাব-রেজিস্ট্রার অমায়িক বাবু দানব হয়ে উঠেছেন। ইতোমধ্যে সরকারি বন্দোবস্তকৃত জমি রেজিস্ট্রি করে দিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা ঘুষ। মহসিনের মধ্যস্থতায় সাব-রেজিস্ট্রিারকে ঘুষ দেন লাখ টাকা সংশ্লিষ্ট দলিল লেখক। মহসিন নেয় ১০ হাজার।এদিকে, কোন জমি প্লট আকারে ক্রয়-বিক্রয় করার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শতকরা ৫% রাজস্ব প্রদানের বিধান রয়েছে কিন্তু এক্ষেত্রে তিনি দলিল লেখকের মাধ্যমে দাতা গ্রহীতাকে প্লট ঘোষণা দিতে নিষেধ করেন। ফলে দাতা, গ্রহীতা ও সাব-রেজিস্ট্রার সকলেই লাভবান হলেও সরকারের ব্যাপক রাজস্বে ক্ষতি হয়। ব্যাংকের মর্টগেজ দলিলেও চান অতিরিক্ত টাকা।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জমি ক্রয়-বিক্রয়কারী ৫% অতিরিক্ত ফি ব্যাংক থেকে চালান করে নিয়ে আসলেও সাব-রেজিস্ট্রার তাকে ফেরত দিয়ে ব্যাংক চালান ভাঙিয়ে নগদ অর্থ গ্রহণ করেন। সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে এমন ঘটনা প্রতিনিয়ত করে চলেছেন। অতিরিক্ত টাকা প্রদান ছাড়া গ্রাহকরা সরকারি কোন সুবিধা ভোগ করতে পারে না। এর ফলে সাধারণ জনগণের নিকট সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। তার কার্যকলাপে সাতক্ষীরা সদর রেজিস্ট্রি অফিসে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ এখন অতিষ্ঠ। তার নৈতিক স্খলন, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও আইন উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সাতক্ষীরাবাসী।জেলা সদরে কর্মরত উন্নয়নকর্মী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব কুয়াশা ফারুক বলেন, সরকারি অফিসগুলোতে সাধারণ মানুষকে মারাত্মক হয়রানি হতে হয়। এর মধ্যে সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমির দলিল করতে প্রান্তিক এলাকার মানুষকে প্রচন্ড ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। এসব বিষয়ের সমাধানে যাদের দেখভালের দায়িত্ব তারা উদাসিন। এজন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা। সাব-রেজিস্ট্রার অমায়িক বাবু সাতক্ষীরা সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগদান করার পর থেকে বেরিয়ে আসছে তার বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও নৈতিক স্খলনে জড়িয়ে পড়ার মতো ঘটনা। সদর সাব-রেজিস্টার অফিসে ঘুষ ছাড়া কোনো দলিল হয় না। এ যেন এক দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য।সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সেবা নিতে আসা পুরাতন সাতক্ষীরা এলাকার আজাদুর রহমান জানান, আমার আইডি কার্ডে নামের বানানে সমস্যা আছে। প্রত্যয়ন দিতে পারবো বলার পরেও একাধিক দলিল লেখকের কাছে ধর্ণা দিয়েও কাজ হয়নি। অফিসের লোকজন আমার কাছে দশ হাজার টাকা ঘুষ চেয়েছে। টাকা দিলে সব সমস্যার সমাধান হবে।এসব অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সাতক্ষীরা সদর সাব-রেজিস্ট্রিার অমায়িক বাবু তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি, এখন আর কোন অনিয়ম হবে না। কেউ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।জেলা রেজিস্ট্রার হাফিজা হাকিম রুমা সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে বলেন, ‘আপনার মাধ্যমে অভিযোগ পেলাম তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ সাতক্ষীরা সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দুর্ণীতির সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার জন্য সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, আইন উপদেষ্টা ও দুদকের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।