নিজস্ব প্রতিবেদক | সাতক্ষীরা
সাতক্ষীরার আটুলিয়া ইউনিয়নে কর্মরত ভূমি সহকারী কর্মকর্তা আশরাফউজ্জামানের বিরুদ্ধে আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, দালাল সিন্ডিকেট পরিচালনা, ঘুষ বাণিজ্য এবং প্রভাব খাটিয়ে অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানের এটি তৃতীয় পর্ব।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি জেলা প্রশাসকের দপ্তরে পৌঁছায় এবং তাকে ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য ডাকা হয়। তবে তলবের পরও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না?
দৃশ্যমান সম্পদ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৫ সালে ভূমি অফিসে চাকরি পাওয়ার পর থেকে তার আর্থিক অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী—
সাতক্ষীরা শহরের মুনজিতপুর এলাকায় প্রায় ৩ কোটি টাকা মূল্যে দুইতলা বাড়ি নির্মাণ।
কাটিয়া এলাকায় প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যে দুটি দোকানসহ একতলা বাড়ি ক্রয়।
সুলতানপুর এলাকায় ৫ শতক জমির আমবাগান (প্রায় ৭০ লাখ টাকা মূল্যে), যা শ্বশুরের নামে ক্রয় করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
গ্রামে কয়েক একর কৃষিজমি ক্রয় এবং পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের আমানত।
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি চাকরির বেতন-ভাতার সঙ্গে দৃশ্যমান সম্পদের পরিমাণের সামঞ্জস্য নেই। বাজারমূল্যে তার মোট সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ৭–৮ কোটি টাকা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ঘুষ ও দালাল সিন্ডিকেটের অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আটুলিয়া ভূমি অফিসে ঘুষ ছাড়া নামজারি, খাজনা দাখিলা বা খাসজমি সংক্রান্ত সেবা পাওয়া কঠিন। একটি সক্রিয় দালাল চক্রের মাধ্যমে ফাইল প্রক্রিয়া হয় বলে দাবি করেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা।
খোলপেটুয়া নদীর চর এলাকায় জমি দখল ও প্লট বণ্টন ঘিরেও একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বৈধ নিলাম বা লিখিত অনুমোদন ছাড়া লেনদেন হয়েছে—এমন অভিযোগও উঠেছে, যদিও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র প্রকাশ্যে আসেনি।
সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ
স্থানীয় সচেতন মহলের একাংশের দাবি, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশ না করতে বা নরমভাবে উপস্থাপন করতে কিছু সাংবাদিককে আর্থিকভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে প্রভাব খাটানো ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং অভিযোগের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।
ভুক্তভোগীর বক্তব্য আটুলিয়ার সাবেক ইউপি সদস্য আবুল বাশার অভিযোগ করেন, দোকান বরাদ্দের নামে তার কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। টাকা ফেরত চাইলে তাকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
অতীতের বিতর্কস্থানীয়দের একাংশের দাবি, পূর্বে অন্য ইউনিয়নে কর্মরত থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে নারী সংক্রান্ত অনৈতিক আচরণের অভিযোগ উঠেছিল। তবে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক আফরোজা আক্তার বলেন, অভিযোগ তার নজরে এসেছে এবং যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযুক্ত আশরাফউজ্জামানের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।
তলবের পরও নীরবতা—উৎসাহ কোথায়?
স্থানীয়দের প্রশ্ন, ডিসি অফিসে তলবের পরও যদি দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত কতটা সম্ভব? অনেকে মনে করছেন, প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া প্রকৃত সত্য উদঘাটন হবে না।
ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জেলা প্রশাসনের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের মতে, দ্রুত তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে সাধারণ মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা পাবে।