ডেক্স রিপোর্ট
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলায় প্রেরণা এনজিওর নির্বাহী পরিচালক ও মোজাহার মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শম্পা গোস্বামীর বিরুদ্ধে অসামাজিক কার্যকলাপ, অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণা ও নানাবিধ দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকলেও কার্যকর প্রতিকার না হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
নিয়োগ ও সাময়িক বরখাস্তের ইতিহাস
সাতক্ষীরার দেবহাটা থানার পাটবাড়ী গ্রামের তপন গোস্বামীর কন্যা শম্পা গোস্বামী ২০০২ সালে মোজাহার মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালে তিনি একটি অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ধরা পড়েন। সে সময় বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তৎকালীন প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ওই ঘটনা স্থানীয় ও জাতীয় বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজা
গত বছরের অক্টোবর মাসে জেলা পরিষদের জায়গার গাছ কাটার অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অমিত কুমার বিশ্বাস শম্পা গোস্বামীকে বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। সাজা ভোগ শেষে তিনি কারাগার থেকে মুক্ত হন বলে জানা গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত না থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উস্কানিমূলক ও ধর্মবিদ্বেষী পোস্ট ছড়িয়ে গুজব রটানোর সঙ্গে জড়িত। এতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে এলাকাবাসীর দাবি।
কলেজ হোস্টেল ভাড়া ও এনজিও কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, কালিগঞ্জ সরকারি কলেজ হোস্টেলের একটি অংশ মাসিক ১০ হাজার টাকা ভাড়ায় ব্যবহার করে তিনি প্রেরণা এনজিওর কার্যক্রম পরিচালনা করলেও দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা ভাড়া পরিশোধ করেননি। এ নিয়ে এলাকায় নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। একাধিকবার বিষয়টি উত্থাপিত হলেও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
এনজিও কর্মচারীদের বেতন সংক্রান্ত অভিযোগ
প্রেরণা এনজিওর কয়েকজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বেতন বিলের কাগজে বেশি অঙ্কে স্বাক্ষর নেওয়া হলেও প্রকৃত অর্থে অর্ধেকেরও কম টাকা প্রদান করা হয়। একজন কর্মচারীর ভাষ্য অনুযায়ী, ৩৫ হাজার টাকার বেতন বিলে স্বাক্ষর করলেও হাতে পান মাত্র ১৫ হাজার টাকা। চাকরি হারানোর ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না বলে তারা জানান। বিদেশি দাতাদের কাগজপত্রে বেশি বেতন দেখানো হলেও বাস্তবে তা দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি ও শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশ
অভিযোগ অনুযায়ী, গত তিন থেকে চার বছর ধরে শম্পা গোস্বামী নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত না হয়েও অর্ধেক বেতন-ভাতা উত্তোলন করে এনজিও কার্যক্রমে দেশে-বিদেশে ভ্রমণ করেছেন। এ প্রেক্ষিতে যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের আদেশক্রমে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর একটি স্মারকের মাধ্যমে প্রেরণা এনজিওতে কাজ না করার শর্তে তাকে সাময়িক বরখাস্ত প্রত্যাহার করে স্বপদে পূর্ণবহাল করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, ওই নির্দেশ উপেক্ষা করেই তিনি এনজিও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন, ফলে বিদ্যালয়ের পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।মানববন্ধন ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের দাবি
এ সকল অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ২২ অক্টোবর কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে এলাকাবাসীর উদ্যোগে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে শম্পা গোস্বামীর অপসারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়। বিদ্যালয়ের অভিভাবক, শিক্ষক ও স্থানীয়রা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অভিযুক্তের বক্তব্য
এ বিষয়ে প্রেরণা এনজিওর নির্বাহী পরিচালক শম্পা গোস্বামী তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।