
কোটি টাকার বাড়ি ও অস্বাভাবিক সম্পদ
ঢাকা জেলার সাবেক ও বর্তমান ইউপি সচিবদের আয়–ব্যয়ের উৎস ঘিরে জনমনে প্রশ্ন
দ্বিতীয় পর্ব : অনুসন্ধানী প্রতিবেদন (তৃতীয় পর্বের জন্য অনুসন্ধান চলছে)
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
১৪ তম গ্রেডে চাকরি পাওয়া, মাত্র এক দশকের ব্যবধানে শতকোটি টাকার মালিক হওয়া ইউপি সচিবদের বিলাসবহুল জীবন ও অস্বাভাবিক সম্পদের বিষয়টি স্থানীয় জনগণের মধ্যে প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে।
ঢাকা জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত ও সাবেক একাধিক ইউপি সচিবের নামে কোটি টাকার বাড়ি, ফ্ল্যাট, জমিজমা ও বিলাসবহুল যানবাহনের তথ্য ঘিরে জনমনে তীব্র কৌতূহল ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সীমিত বেতন–ভাতা ও সরকারি সুযোগ-সুবিধার বাইরে এসব সম্পদের প্রকৃত আয়ের উৎস কী—তা নিয়েই স্থানীয় পর্যায়ে বিস্তর আলোচনা চলছে।
প্রথম পর্বে আলোচিত নামের বাইরে, দৈনিক যশোর বার্তার অনুসন্ধানে দ্বিতীয় পর্বে আরও কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান ইউপি সচিবের নাম উঠে এসেছে, যাঁদের বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম এবং সামাজিক ক্ষতির অভিযোগ রয়েছে।
নতুন করে উঠে আসা নাম ও অভিযোগ
চৌহাট ইউনিয়ন (ধামরাইল) – নাহিদ
নাহিদের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগ পাহাড়সম। তিনি শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, বরং নারীদের হয়রানি, প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং সেবা বিতরণে প্রভাব খাটিয়ে নিজস্ব সুবিধা গ্রহণের অভিযোগে যুক্ত। এছাড়া, তিনি মাদক সেবনের সঙ্গে যুক্ত একজন বড় মাদকসেবীর সংযোগে থাকার অভিযোগও রয়েছে। মাদক না পেলে তাঁর আচরণে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়, যা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আমতা ইউনিয়ন – আজহারুল ইসলাম
উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ অনুমোদনে প্রভাব খাটিয়ে কমিশন গ্রহণ এবং কাজ না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
শাক্তা ইউনিয়ন (কেরানীগঞ্জ) – কামিল উল্লাহ
নাগরিক সনদ, ওয়ারিশ সনদ ও অন্যান্য প্রত্যয়নপত্রে ঘুষ গ্রহণ এবং দালাল ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব কাজ করানোর অভিযোগ রয়েছে।সাভার উপজেলার তেঁতুলঝরা ইউনিয়নের ইউপি সচিব আমির হোসেন
সেতুপাড়া ইউনিয়ন (কেরানীগঞ্জ) – মোশারফ হোসেন
ইউনিয়ন পরিষদের ক্রয় কার্যক্রমে অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে।
তারানগর ইউনিয়ন (কেরানীগঞ্জ) – সাবেক সচিব মোঃ আব্দুল গনি
ভূমি সংক্রান্ত কাগজপত্র ও নামজারির সুপারিশে প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, মাত্র এক দশকের ব্যবধানে শতকোটি টাকার মালিক হওয়া, বহুতল ভবন ও রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট অধিগ্রহণ—সবই প্রশ্নের মুখে।
যাদবপুর ইউনিয়ন – শরিফুজ্জামান
রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তের বাইরে রাখার চেষ্টা করার অভিযোগ রয়েছে।
ধামরাইল ইউনিয়ন – মহিউল উদ্দিন
কর্মচারী নিয়োগ ও অস্থায়ী কাজে অর্থ লেনদেন এবং সরকারি সুবিধাভোগী তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
আমিনবাজার ইউনিয়ন – আফজাল হোসেন
বড় উন্নয়ন প্রকল্পে স্বাক্ষরের মাধ্যমে ঠিকাদারদের কাছ থেকে নিয়মিত আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
তেঘরিয়া এলাকা (কারওয়ান বাজার) – জামান মিয়া
বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে দালাল চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
গাংনটিয়া ইউনিয়ন (ধামরাই) – সাবেক ইউপি সচিব শ্যাম সুন্দর মন্ডল
অনুসন্ধানের দ্বিতীয় পর্বে ধামরাই উপজেলার গাংনটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক ইউপি সচিব শ্যাম সুন্দর মন্ডলের নামও উঠে এসেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তাঁর দায়িত্বকালীন সময়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আর্থিক লেনদেন ও সম্পদ অর্জনের স্বচ্ছতা নিয়ে ইউনিয়নবাসীর মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়। সীমিত সরকারি বেতন–ভাতার বাইরে তাঁর সম্পদের প্রকৃত উৎস কী—তা নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ও প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অভিযোগভুক্ত অনেকেই পূর্ববর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল ও স্বৈরাচারী দোসরদের ছত্রচ্ছায়ায় এসব অনিয়ম চালিয়েছেন। ওই সময় জবাবদিহির অভাব থাকায় অভিযোগগুলো কার্যকর তদন্তের মুখ দেখেনি। সচেতন মহল মনে করছে, এই ধরনের রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া এখনো স্থানীয় প্রশাসনে প্রভাব রাখতে পারে।তদন্তের প্রস্তাবনা দুর্নীতিবিরোধী বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের মতে সম্পদ বিবরণী ও ব্যাংক লেনদেন পরীক্ষা,আয়কর নথি যাচাই, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বার্থের সংঘাত বিশ্লেষণ,আচরণগত ও স্বাস্থ্যগত মূল্যায়ন (প্রয়োজনে ডোপ টেস্ট),
ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের বক্তব্য গ্রহণ—
এই সবকিছু মিলিয়েই হতে পারে একটি গ্রহণযোগ্য তদন্ত।
বক্তব্য পাওয়ার চেষ্টা
এই প্রতিবেদনে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কেউ আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেননি। নীতিগতভাবে তাঁদের বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ রাখা হয়েছে।
উপসংহার বিশ্লেষকদের মতে, ইউনিয়ন পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক স্তরে দুর্নীতি ও সামাজিক ক্ষতির অভিযোগ জনআস্থাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অভিযোগগুলো সত্য হলে আইনানুগ ব্যবস্থা, আর মিথ্যা হলে স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্তদের সুনাম রক্ষা—উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ অপরিহার্য।
দৃষ্টি আকর্ষণ: তৃতীয় পর্বের জন্য অনুসন্ধান চলছে। আরও কিছু দুর্নীতিবাজের নাম ও তাদের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।