
সিলেটের আকাশ যেন কখনও পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নয়! সীমান্তের ওপারে মেঘের রাজ্য মেঘালয়, আর খুব কাছেই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের অঞ্চল চেরাপুঞ্জি। প্রকৃতির এই ভৌগোলিক বাস্তবতা সিলেটকে করে তুলেছে বৃষ্টি-নির্ভর এক শহর। রোদ আর মেঘের লুকোচুরির মধ্যেই এখানকার মানুষের জীবন, আর সেই একই অনিশ্চয়তা এখন ঘিরে আছে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সিরিজের শেষ টেস্টকেও।শনিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া টেস্টের পাঁচ দিনজুড়েই রয়েছে বৃষ্টির পূর্বাভাস। প্রথম দিনেই বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা ৮৯ শতাংশ। আকাশের প্রায় পুরোটা ঢেকে থাকতে পারে মেঘে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, দিনে ১১.৭ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে।টেস্টের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে কিছুটা কমলেও চতুর্থ দিনে আবার ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে আবহাওয়া। সেদিন বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা ৯৮ শতাংশ, সকালের দিকে যা আরও বেশি। বজ্রপাতের শঙ্কাও প্রবল। তবে শেষ দিনে কিছুটা স্বস্তির খবর আছে-পঞ্চম দিনে বৃষ্টির সম্ভাবনা মাত্র ১৯ শতাংশ।তবে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের ভেতরে যেন আবহাওয়ার এই ভয়কে খুব বেশি পাত্তা দিতে রাজি নন কেউ। ভেন্যু ম্যানেজার জয়দীপ দাস সুজয় জানিয়েছেন, বৃষ্টি হলেও মাঠ দীর্ঘ সময় অচল হয়ে থাকবে না। তার দাবি, এই মাঠের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এতটাই উন্নত যে মুষলধারে বৃষ্টির পরও আধঘণ্টা থেকে চল্লিশ মিনিট সময় পেলেই মাঠ আবার খেলার উপযোগী করা সম্ভব।এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও আছে। মিরপুরে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে প্রবল বর্ষণের পরও দ্রুত খেলা শুরু করা গিয়েছিল। একইভাবে বিসিএলের ম্যাচ খেলতে এসে সিলেটের মাঠ নিয়েও সন্তুষ্ট হয়েছেন মুশফিকুর রহিম।সংবাদ সম্মেলনে মুশফিক বলেছেন, ‘এখানে একটা জিনিস ভালো। মিরপুরের মতো এখানেও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বিশ্বমানের। সম্প্রতি আমরা বিসিএলে যে ম্যাচটা খেলেছি, চার দিনই আগের রাতে অনেক বৃষ্টি হয়েছে। তবে প্রতিদিনই একই সময়ে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে খেলা শুরু হয়েছে। যদি দিনে বৃষ্টি না হয়, তো আমি মনে করি যে, এখানে মাঝে মাঝে বৃষ্টির বিরতি দিয়ে হলেও খেলা হতে পারে। তবে যেহেতু পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভালো, যদি আবহাওয়াটা একটু ভালো হয়, তাহলে এখান থেকেও টেস্টে ফল বের করে আনা সম্ভব। আর আমরা চেষ্টা করব, যতটুকু খেলা হবে সেখানে যেন আমরা ইতিবাচক একটা প্রভাব ফেলতে পারি।’
আধুনিক টেস্ট ক্রিকেটে বৃষ্টি এখন শুধু আবহাওয়ার বিষয় নয়, এটি মানসিকতারও পরীক্ষা। খেলা থেমে যাওয়া মানেই ড্রেসিংরুমে দীর্ঘ অপেক্ষা, ছন্দ হারানোর শঙ্কা, মনোযোগে ভাটা। সেই বাস্তবতা খুব ভালোভাবেই জানেন মুশফিক। তাই তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন মানসিক প্রস্তুতিকে!মুশফিক বলেন, ‘এখন বৃষ্টির মৌসুম প্রায় চলে এসেছে। আমরা জানতাম যে, ঢাকার টেস্ট পুরোটা হলেও থেমে থেমে হবে। কারণ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এ রকম ছিল। পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে আমি মনে করি, এটা প্রাত্যহিক কাজেরই একটি অংশ। এখন এটা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করার কিছু নেই। তবে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, খেলার সময় আমরা যেন সব মনোযোগ খেলাতেই দিই। যখন খেলা থেমে থাকবে, তখন খেলা নিয়ে বেশি না ভাবি। যখন আমার কাজ শুরু হবে তখন যেন আমরা সুইচ অন থাকি। আর যখন হবে না, তখন যেন আমরা অফ থাকি এবং আমরা অন্যকিছুতে ফোকাস করি।’
সিলেটের আবহাওয়া গত কয়েক দিনেও একই চরিত্র দেখিয়েছে। দিনের বেলা তীব্র রোদ, আবার রাত নামলেই বৃষ্টি। শুক্রবার সকালেও থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে, যদিও দুপুরের দিকে আকাশ কিছুটা পরিষ্কার হয়। মাঠকর্মীদের প্রস্তুতি, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দ্রুত পানি সরানোর সক্ষমতা মিলিয়ে ভেন্যু কর্তৃপক্ষ আশাবাদী-যতই বৃষ্টি হোক, ম্যাচ সচল রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে।বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ শুরুর পর থেকে টেস্ট ক্রিকেটে ফল বের করে আনার মানসিকতা আরও আক্রমণাত্মক হয়েছে। সময় কম পেলেও ঝুঁকি নিতে পিছপা হয় না দলগুলো। বছর দুই আগে কানপুরে সাকিব আল হাসান শেষ টেস্ট ম্যাচেই প্রথম তিন দিনে মাত্র ৩৫ ওভার খেলা হয়েছিল, তবু শেষ দুই দিনেই ম্যাচে ফল এসেছিল।সিলেটেও হয়তো সেই চ্যালেঞ্জই অপেক্ষা করছে। আকাশে থাকবে মেঘ, মাঝেমধ্যে নেমে আসবে বৃষ্টি, খেলা থামবে আবার শুরু হবে। কিন্তু সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই ইতিবাচক ফল বের করে আনার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ। আর সেই স্বপ্নের কথাই শোনালেন মুশফিকুর রহিম!