সাবেক কর্মস্থলে পাহাড়সম অভিযোগ, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান গেয়েও আলোচনায় ঢাকার ডিসি ফরিদা খানম—এ যেন নাটকীয় গল্প!
চট্টগ্রামের খাসজমি, বালুমহাল ও সরকারি তহবিল নিয়ে পুরোনো বিতর্ক; ঢাকায় ইউপি সচিবদের বদলি ঘিরে আবারও ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ, তদন্তের দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক:
এক কর্মস্থলের পুরোনো অভিযোগের রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন কর্মস্থলে আবারও নানা অভিযোগ ও প্রশ্নের মুখে ঢাকার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানম। চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে সরকারি খাসজমি, ভূমির রেকর্ড, বালুমহাল ইজারা এবং সরকারি তহবিলের অর্থ ব্যয় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে তাঁর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ঘিরে নানা অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছিল। সেসব অভিযোগের কয়েকটি বিষয়ে তদন্তের তথ্যও গণমাধ্যমে উঠে আসে।
অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে গান পরিবেশন এবং বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনায় ছিলেন তিনি। তবে এসব পরিচিতির পাশাপাশি তাঁর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর তদন্তের অগ্রগতি কী, তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
চট্টগ্রামের পুরোনো বিতর্কের পর ঢাকায় দায়িত্ব গ্রহণ করে এবার ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (ইউপি সচিব) বদলি ও পদায়ন ঘিরে নতুন অভিযোগের মুখে পড়েছেন ফরিদা খানম। অভিযোগকারীদের দাবি, লটারির মাধ্যমে ইউপি সচিবদের বদলি কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর আবারও চারজন ইউপি সচিবকে বদলি করা হয়েছে। আর এই চারজনের বদলিকে কেন্দ্র করে প্রায় ৫০ লাখ টাকা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
চট্টগ্রামের কর্মস্থলে খাসজমি নিয়ে বিতর্ক চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নগরের পরীর পাহাড় এলাকায় জেলা প্রশাসনের উচ্ছেদ করা ২৩ শতকের বেশি সরকারি জমি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, উচ্ছেদের পর জনস্বার্থে ব্যবহারের পরিবর্তে ওই জমি অস্থায়ীভাবে বন্দোবস্ত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। জমিটি কোন বিধি অনুযায়ী এবং কী মেয়াদে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।তবে সে সময় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, জমিটি এক বছরের জন্য অস্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে পাকা স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি নেই।
সরকারি খাসজমি ব্যক্তিমালিকানায় নামজারির অভিযোগ
চট্টগ্রামের হিলভিউ আবাসিক এলাকার সরকারি খাসজমি ব্যক্তিমালিকানায় নামজারি করার অভিযোগও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। এ ঘটনায় ভূমি মন্ত্রণালয়ের তদন্তের তথ্য প্রকাশ্যে আসে। ভূমির রেকর্ড, নামজারি এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।চট্টগ্রামের তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার ফরিদা খানমের বিরুদ্ধে একাধিক তদন্তের কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।তবে এসব তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল কী এবং কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি দিয়ে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।বালুমহাল ইজারা ও ভূমির রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে বালুমহাল ইজারা প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং ভূমির রেকর্ড জালিয়াতি নিয়েও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ প্রকাশিত হয়।সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, ইজারা প্রক্রিয়া এবং ভূমি রেকর্ড সংক্রান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। এসব বিষয়ে তদন্ত হয়ে থাকলে তার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন ও সিদ্ধান্ত জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার তহবিলের অর্থ ব্যয় নিয়ে বিতর্কচট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার তহবিল ব্যবহারের বিষয়টিও একসময় আলোচনায় আসে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চিড়িয়াখানার অর্থ প্রশাসন ক্যাডারের পিকনিক, পুনর্মিলনী, বিজ্ঞাপনসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছিল।
একটি প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৮ জুলাই পর্যন্ত চিড়িয়াখানার তহবিল থেকে প্রায় ১৯ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ব্যয়ের তথ্য তুলে ধরা হয়।তবে ফরিদা খানম এ ধরনের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করে ব্যয়ের বিষয়ে তাঁর প্রশাসনিক ক্ষমতার কথা জানিয়েছিলেন। ফলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানতে সংশ্লিষ্ট অডিট প্রতিবেদন ও সরকারি নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান, মানবিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতিফরিদা খানমকে নিয়ে আলোচনার আরেকটি দিক হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে তাঁর গান পরিবেশন এবং বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডের প্রচার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ড ও ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। তবে একজন সরকারি কর্মকর্তার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বা মানবিক উদ্যোগের সঙ্গে প্রশাসনিক অভিযোগকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।প্রশ্ন হচ্ছে, একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে যেসব প্রশাসনিক অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোর তদন্তের অগ্রগতি কী? মানবিক কর্মকাণ্ডের প্রচারের পাশাপাশি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।ঢাকায় যোগদানের পর ইউপি সচিবদের বদলি নিয়ে নতুন বিতর্কচট্টগ্রামের পুরোনো অভিযোগের আলোচনা চলার মধ্যেই ঢাকার জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ফরিদা খানমকে ঘিরে নতুন করে ইউপি সচিবদের বদলি ও পদায়ন নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।এর আগে ২০২৬ সালের ২২ জুলাই ঢাকা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ৫২ জন ইউপি সচিবকে নিয়ে লটারির মাধ্যমে পদায়ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি, লটারির মাধ্যমে বদলি কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর নতুন করে চারজন ইউপি সচিবকে বদলি করা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, এই বদলির পেছনে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রশ্ন উঠেছে, লটারির মাধ্যমে পদায়নের পর আবারও চারজনকে কী কারণে বদলি করা হলো? তাঁদের বদলির আবেদন, সুপারিশ এবং অনুমোদনের প্রক্রিয়া কী ছিল? এসব সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো বিশেষ বিবেচনা কাজ করেছে কি না, তা জানার দাবি উঠেছে।চারজন ইউপি সচিবের বদলিতে ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, চারজন ইউপি সচিবের বদলি ঘিরে প্রায় ৫০ লাখ টাকা আর্থিক লেনদেন হয়েছে। তাঁদের দাবি, বদলি-পদায়নকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী বলয় কাজ করছে।। তবে অভিযোগটি গুরুতর হওয়ায় সংশ্লিষ্ট বদলির আদেশ, আবেদনপত্র, সুপারিশ, অনুমোদন এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।প্রশাসনের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
১. লটারির মাধ্যমে বদলি কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর চারজন ইউপি সচিবকে নতুন করে বদলি করার কারণ কী?
২. তাঁদের বদলির আদেশ কোন বিধি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দেওয়া হয়েছে?
৩. বদলির জন্য কারা সুপারিশ করেছেন এবং কারা অনুমোদন দিয়েছেন?
৪. ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে কোনো লিখিত অভিযোগ বা আর্থিক প্রমাণ রয়েছে কি না?
৫. এসব অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কোনো তদন্ত শুরু করেছে কি না?
৬. চট্টগ্রামের কর্মকালীন সময়ে ওঠা পুরোনো অভিযোগগুলোর তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল কী?
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
অভিযোগকারীরা বলছেন, সরকারি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকারী কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে আখ্যায়িত করাও উচিত নয়।
তাঁদের দাবি, চট্টগ্রামের কর্মকালীন সময়ের ভূমি, খাসজমি, বালুমহাল ও তহবিল ব্যবহারের অভিযোগ এবং ঢাকায় ইউপি সচিবদের বদলি-পদায়ন নিয়ে ওঠা নতুন অভিযোগগুলো আলাদাভাবে তদন্ত করতে হবে।
বিশেষ করে চারজন ইউপি সচিবের বদলির আদেশ, সংশ্লিষ্ট আবেদন, সুপারিশ এবং অনুমোদনের নথি প্রকাশ করা হলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে।
বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা, ফোন রিসিভ না করায় পাওয়া যায়নি মন্তব্য
এসব অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের বক্তব্য জানতে তাঁর সরকারি ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে বারবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে তাঁর লিখিত বক্তব্য, ব্যাখ্যা কিংবা অভিযোগের বিষয়ে কোনো তথ্য বা নথি পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
শেষ কথা: অভিযোগের তদন্ত কোথায়? একদিকে চট্টগ্রামের কর্মকালীন সময়ে সরকারি জমি, ভূমির রেকর্ড, বালুমহাল ও সরকারি তহবিল নিয়ে পুরোনো অভিযোগ; অন্যদিকে ঢাকায় ইউপি সচিবদের বদলি-পদায়ন ঘিরে নতুন করে ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের দাবি—সব মিলিয়ে ফরিদা খানমকে ঘিরে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এসেছে।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান পরিবেশন কিংবা মানবিক কর্মকাণ্ডের প্রচার কোনো অভিযোগের সত্যতা বা অসত্যতা নির্ধারণ করে না। একজন সরকারি কর্মকর্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা, আইন মেনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জনস্বার্থ রক্ষা।
অতএব, অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও পরিষ্কার করতে হবে।
জনগণের প্রশ্ন একটাই—চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা, এত অভিযোগ ও বিতর্কের পর সংশ্লিষ্ট তদন্তগুলোর ফলাফল কোথায়?