
নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা:
সাতক্ষীরা সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে আবারও উঠেছে ভয়াবহ দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, দালাল সিন্ডিকেট ও মাদক সেবনের গুরুতর অভিযোগ। দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া এই অফিসে এখন নতুন করে যোগ হয়েছে রাতের বেলায় অসামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ। এতে করে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সেবাগ্রহীতা, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন মহল।ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ঘুষ ছাড়া অধিকাংশ কাজ এগোয় না। দলিল রেজিস্ট্রি, জমি হস্তান্তর, নামজারি কিংবা বিভিন্ন কাগজপত্র সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে আসা মানুষকে প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য করা হয়। সরকারি নির্ধারিত ফি’র বাইরে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে।স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অফিসের ভেতরে একটি শক্তিশালী দালাল ও অসাধু কর্মচারী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। তারা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে অর্থ আদায় করছে। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার ফাইল আটকে রাখা, অযথা ভুল ধরা, দিনের পর দিন ঘুরানো কিংবা জটিলতা সৃষ্টি করা হয়। ফলে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তি ও মানসিক চাপের মধ্যে পড়ছেন।অফিস সহকারী মহসিনসহ কয়েকজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র অফিসের ভেতরে ও বাইরে প্রভাব বিস্তার করে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। স্থানীয়দের দাবি, এই চক্রের ছত্রছায়ায় বছরের পর বছর ধরে চলছে দুর্নীতি ও অনিয়মের মহোৎসব।এদিকে নৈসিপুরোহারি জাহিদের বিরুদ্ধেও উঠেছে বিস্ফোরক অভিযোগ। স্থানীয় সূত্র ও কয়েকজন রাতের পাহারাদারের দাবি, গভীর রাত পর্যন্ত অফিস এলাকায় অবস্থান করে তিনি নিয়মিত মাদক সেবন করেন। অভিযোগ রয়েছে, তার নেতৃত্বে কিছু অসাধু ব্যক্তির আড্ডা রাত গভীর পর্যন্ত চলতে দেখা যায়। পাহারাদারদের ভাষ্যমতে, অফিসের নির্জন পরিবেশকে ব্যবহার করে সেখানে নানা ধরনের অসামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় বলে সন্দেহ রয়েছে।একাধিক পাহারাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “রাতের দিকে অফিস এলাকায় অনেক সময় অস্বাভাবিক পরিবেশ দেখা যায়। গভীর রাত পর্যন্ত কিছু লোকজনের আনাগোনা থাকে। বিষয়টি নিয়ে আমরা আতঙ্ক ও অস্বস্তির মধ্যে থাকি।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ বলছেন, একটি সরকারি অফিসকে কেন্দ্র করে এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত লজ্জাজনক। এতে শুধু অফিসের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে না, বরং সাধারণ মানুষের আস্থাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তারা বলছেন, দ্রুত তদন্ত না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।অভিযোগ আরও রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে ব্যক্তি স্বার্থ হাসিল করা হচ্ছে। এতে একদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ প্রতারণা ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, দালাল ছাড়া অফিসে গিয়ে সহজে কাজ সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
সচেতন মহলের দাবি, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব অনিয়মের পেছনে শক্তিশালী একটি চক্র কাজ করছে। প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তির নীরব সহযোগিতায় তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে সদ্য যোগদান করা সাব-রেজিস্ট্রার অমায়িক বাবুর বিরুদ্ধেও অফিসে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ মানুষের দাবি, নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পরও ঘুষ বাণিজ্য, দালাল সিন্ডিকেট ও অনিয়ম বন্ধ হয়নি। বরং আগের মতোই সবকিছু চলছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সাতক্ষীরা সদর দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির বলেন, “অফিসে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়ম হয় না। কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি।”অন্যদিকে সাব-রেজিস্ট্রার অমায়িক বাবু বলেন, “এ বিষয়ে সরাসরি অফিসে এসে কথা বলতে হবে।”জেলা রেজিস্ট্রার হাফিজা খাতুন রুমা বলেন, “লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”সাতক্ষীরার সচেতন নাগরিক সমাজ, সেবাগ্রহীতা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও মাদক সংশ্লিষ্ট অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে দালালমুক্ত, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।