নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা:
সাতক্ষীরা জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. আব্দুস সালামকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ ও সমালোচনা সামনে এসেছে। দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অনিয়ম থেকে শুরু করে কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণ, মাদক সেবন এবং নারী কর্মচারীর সঙ্গে অনৈতিক আচরণের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এসব অভিযোগের পরও তিনি কীভাবে দায়িত্বে বহাল রয়েছেন—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।২০২৫ সালের মার্চে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে এক নারী কর্মচারীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, অভিযোগকারী স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। তবে অভিযোগটির বিষয়ে পরবর্তীতে কী ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং তদন্তের চূড়ান্ত ফল কী—তা সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি দিয়ে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।অন্যদিকে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে সিভিল সার্জনের অপসারণের দাবিতে সাতক্ষীরায় মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। সেখানে বক্তারা দুর্নীতি, কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণ, নিয়মিত অফিসে উপস্থিত না থাকা এবং নারী কর্মচারীকে কুপ্রস্তাব দেওয়ার মতো বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করেন। তবে একই প্রতিবেদনে সিভিল সার্জন এসব অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত হয়েছে এবং তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন বলে দাবি করেন।মাদক সেবনের অভিযোগও আলোচনায়
সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে মদ্যপান বা মাদক সেবনের অভিযোগও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে মেডিকেল পরীক্ষা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথি অথবা সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন প্রয়োজন। শুধুমাত্র অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে মাদকসেবী হিসেবে চূড়ান্তভাবে আখ্যায়িত করা সমীচীন নয়।নারী কর্মচারীর অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন২০২৫ সালের একটি প্রকাশিত প্রতিবেদনে একজন নারী কর্মচারীর লিখিত অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে অভিযোগকারীর বক্তব্য এবং সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে আনা বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে অভিযুক্ত সিভিল সার্জনের বক্তব্যও উল্লেখ করা হয় যে অভিযোগকারী অভিযোগ প্রত্যাহার করেছেন।
ফলে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন হচ্ছে—অভিযোগটি আদৌ প্রত্যাহার হয়েছিল কি না, কোনো বিভাগীয় তদন্ত হয়েছিল কি না, তদন্ত হলে তার সিদ্ধান্ত কী ছিল এবং অভিযোগের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কী ব্যবস্থা নিয়েছিল?দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষাপটসাতক্ষীরা স্বাস্থ্য বিভাগের অনিয়ম নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তবে বর্তমান সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য, ২০২০ সালে তৎকালীন সাবেক সিভিল সার্জনসহ নয়জনের বিরুদ্ধে ১৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছিল বলে The Finance Today জানিয়েছিল। এটি বর্তমান সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; বরং সাতক্ষীরা স্বাস্থ্য প্রশাসনে অতীতে দুর্নীতির অভিযোগের একটি পৃথক ঘটনা।এ ছাড়া ২০২৬ সালের মার্চে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রায় ৫৪ লাখ টাকা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এই ঘটনাটিও বর্তমান সিভিল সার্জনের ব্যক্তিগত দায় প্রমাণ করে না; বরং স্বাস্থ্য খাতের নিয়োগ ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা একটি পৃথক অভিযোগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
তাহলে বহাল থাকার কারণ কী?সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—এত অভিযোগ, প্রতিবাদ ও সংবাদ প্রকাশের পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যদি দায়িত্বে বহাল থাকেন, তাহলে তার পেছনে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কী?
সরকারি সূত্র অনুযায়ী বর্তমানে সাতক্ষীরা জেলার সিভিল সার্জন হিসেবে ডা. মো. আঃ সালামের নাম সরকারি ডিরেক্টরিতে রয়েছে।তাই জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—১. সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিয়ে কতটি বিভাগীয় তদন্ত হয়েছে?২. কোনো তদন্ত হয়ে থাকলে তার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন কোথায়?৩. অভিযোগগুলো সত্য বা মিথ্যা প্রমাণিত হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?৪. নারী কর্মচারীর অভিযোগের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?
৫. মদ্যপান বা মাদক সেবনের অভিযোগের বিষয়ে কোনো মেডিকেল বা প্রশাসনিক তদন্ত হয়েছিল কি না?৬. দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে কোনো লিখিত তদন্ত বা অডিট হয়েছে কি না?
৭. অভিযোগগুলো সত্য না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়মুক্ত করার নথি প্রকাশ করা হবে কি না?তদন্তের দাবিসিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর কোনটি সত্য আর কোনটি ভিত্তিহীন—তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের। তাই অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠেছে। জনস্বার্থে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার কাছে দাবি—সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করে সত্যতা প্রকাশ করা হোক। অভিযোগ সত্য হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগ অসত্য হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো হোক। এ বিষয়ে সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন আব্দুস সালামের কাছে জানতে চাইলে তার ব্যবহৃত নাম্বারে ফোন দিলে তিনি বলেন আপনি অফিসে আসেন চা খাওয়ার দাওয়াত থাকলো