
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:সাতক্ষীরার আশাশুনি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দালালচক্রের দৌরাত্ম্যে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ। অভিযোগ উঠেছে, সাব-রেজিস্টার মিন্টু চক্রবর্তীর নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি, ঘুষ বাণিজ্য এবং নানা অনিয়ম সংঘটিত হচ্ছে। এতে যেমন সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তেমনি সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাব-রেজিস্টার মিন্টু চক্রবর্তী আশাশুনি অফিসে যোগদানের পর থেকেই বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ক্রমেই সামনে আসতে শুরু করে। অভিযোগ রয়েছে, তার নেতৃত্বে দলিল লেখক, নকলনবিশ এবং দালালদের নিয়ে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সক্রিয় সদস্য হিসেবে নকলনবিশ নির্মল সরকারের নাম স্থানীয়ভাবে আলোচিত।এলাকাবাসীর অভিযোগ, আশাশুনি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষ ছাড়া কোনো দলিল রেজিস্ট্রি হয় না। সরকারি নির্ধারিত ফি ছাড়াও সাব-রেজিস্টারের নির্ধারিত আলাদা ‘রেট’ রয়েছে। সেই রেট অনুযায়ী অর্থ প্রদান না করলে দলিল রেজিস্ট্রির কাজ দীর্ঘসূত্রিতার ফাঁদে ফেলে দেওয়া হয় কিংবা নানা অজুহাতে হয়রানি করা হয়।
ভুক্তভোগীদের দাবি, একটি সাধারণ সাফ কবলা দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে প্রতি লাখে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। প্রথম লাখে প্রায় এক হাজার টাকা, পরবর্তী দশ লাখ পর্যন্ত প্রতি লাখে প্রায় চারশ টাকা এবং দশ লাখের বেশি হলে প্রতি লাখে প্রায় তিনশ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ঘুষ দিতে হয়। দলিলের মূল্য এক কোটির বেশি হলে দরদামের মাধ্যমে আলাদা করে অর্থ নির্ধারণ করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।শুধু সাফ কবলা নয়, দানপত্র, হেবাবিল, এওয়াজ বদল, বণ্টননামা ও না-দাবি দলিলসহ বিভিন্ন ধরনের দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রেও আট হাজার থেকে বিশ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আবার জমি সংক্রান্ত কোনো জটিলতা থাকলে সেই অঙ্ক বেড়ে ৫০ হাজার থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জমি রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রেও বিভিন্ন কৌশলে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, অনেক সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের জমি রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে নানা অজুহাতে ভয়ভীতি দেখিয়ে বড় অঙ্কের ঘুষ নেওয়া হয়।সরকারি রাজস্ব ফাঁকির ক্ষেত্রেও সাব-রেজিস্টার মিন্টু চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। জানা গেছে, আশাশুনির বুধহাটা মৌজায় একটি কোল্ড স্টোরেজ ও আইস ফ্যাক্টরির প্রায় দুই শতাধিক শতক জমি রেজিস্ট্রির সময় বিপুল অঙ্কের ঘুষ নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে প্রায় ৬০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার বিনিময়ে সরকারের প্রায় দুই কোটি টাকার রাজস্ব ছাড় দেওয়া হয়েছে।এছাড়া জমি প্লট আকারে ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পাঁচ শতাংশ রাজস্ব দেওয়ার বিধান থাকলেও অনেক সময় দলিল লেখকদের মাধ্যমে দাতা ও গ্রহীতাকে প্লট ঘোষণা না দিতে পরামর্শ দেওয়া হয়। এর ফলে সরকার রাজস্ব হারালেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা লাভবান হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জমি ব্যবসায়ী জানান, তিনি অতিরিক্ত পাঁচ শতাংশ রাজস্ব ব্যাংকে জমা দিয়ে চালান নিয়ে এলেও তা গ্রহণ না করে নগদ অর্থ দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়।অভিযোগ আরও রয়েছে, অফিসে কর্মরত কিছু অসাধু কর্মচারী ও দালালদের নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে, যারা প্রতিদিন সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে নানা কৌশলে অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য করছে। এতে আশাশুনি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এখন কার্যত দালালদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয়রা।এদিকে সাব-রেজিস্টার মিন্টু চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত জীবনযাপন নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের মধ্যে তার নৈতিক স্খলন, নেশাগ্রস্ততা এবং অসদাচরণের অভিযোগও শোনা যাচ্ছে, যা প্রশাসনিক মহলেও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।এমন পরিস্থিতিতে আশাশুনি উপজেলার সাধারণ মানুষ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাদের দাবি, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে সাধারণ মানুষ হয়রানি থেকে মুক্তি পাবে এবং সরকারি রাজস্বও সুরক্ষিত থাকবে।